স্বপ্ন ছোঁয়া পাহাড়: সেনাবাহিনীর হাত ধরে মদকে সড়ক যোগাযোগের নতুন যুগ

দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়ি জনপদ হিসেবে পরিচিত বান্দরবানের থানচি উপজেলার মদক এলাকা ছিল দেশের মূল সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন। স্বাধীনতার পর থেকে এখানকার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল শঙ্খ নদীর নৌপথ, যা বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে হয়ে উঠত অত্যন্ত ঝুঁকি

পূর্ণ ও দুর্ভোগপূর্ণ। অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো মদক এলাকায় পৌঁছেছে সড়ক যোগাযোগ।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধীনে ১৭ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (১৭ ইসিবি) থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই যুগান্তকারী উদ্যোগ সম্পন্ন করেছে।

গত ১৯ মে বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে সড়কটির যাত্রা শুরু হয়। ৭০ নম্বর সীমান্ত পিলার অতিক্রম করে ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম গাড়িযোগে বড় মদক এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয়দের মাঝে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এ সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জুবায়ের-আল-হাসানসহ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

স্থানীয়দের মতে, এই সড়কটি শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, বরং এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। প্রায় ৪৫০টিরও বেশি পরিবার সরাসরি এই সুবিধার আওতায় এসেছে।

সড়ক চালুর ফলে জরুরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ সহজ হবে এবং মুমূর্ষু রোগীদের আর দীর্ঘ সময় নৌপথে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হবে না। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত সহজ হবে এবং স্থানীয় কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে। সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণেরও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের ক্রীড়া ও মানসিক বিকাশেও গুরুত্ব দিয়েছে সেনাবাহিনী। ১৭ ইসিবি’র উদ্যোগে বড় মদক এলাকায় একটি ফুটবল মাঠ নির্মাণ করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করেন। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণের অংশ হিসেবে সড়কের দুই পাশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পালন করা হয়।

দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে স্বস্তি ও আনন্দ বিরাজ করছে। স্থানীয় পাড়া কারবারি সাচিং ফ্র জেরী জানান, বর্ষা মৌসুমে আগে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত, তবে নতুন সড়ক নির্মাণের ফলে সেই কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছে। শিক্ষার্থী লিকং মারমা বলেন, স্বাধীনতার পর এই প্রথম সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে।

দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, জনসেবার সম্প্রসারণ এবং সীমান্তবর্তী এলাকার উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *